লেখক:কৌনিক দেবনাথ
১৫৩০ সালের আগস্টের এক সকালে, মস্কোর ক্রেমলিনে জন্ম নিল এক শিশু ইভান ভ্যাসিলিভিচ। রাজবংশের সন্তান হলেও তার শৈশবের দিনগুলোতে কোনো রাজকীয় নিরাপত্তা বা উষ্ণতা ছিল না। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারাল, আর অল্প কিছুদিনের মধ্যে মা এলেনা গ্লিনস্কায়াকেও বিষপ্রয়োগে হারাল। এরপর মস্কোর ক্ষমতার করিডরে শুরু হল বয়ারেরা অভিজাত অভিজাতি কারা আসলে রাজদরবার চালাবে সেই ঠান্ডা যুদ্ধ। শিশুটি এসব চুপচাপ দেখত, কিন্তু তার মনে গেঁথে যাচ্ছিল ক্ষমতা মানে ভয়, আর বেঁচে থাকা মানে শাসন করতে শেখা। ১৬ বছর বয়সে, ১৫৪৭ সালের ২৬ জানুয়ারি, তিনি রাশিয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক “জার” হলেন। এই উপাধি শুধুই শিরোপা ছিল না এটি একটি ঘোষণাপত্র, যে এখন মস্কো শুধু একটি প্রিন্সিপ্যালিটি নয়, বরং বাইজেন্টাইন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী এক সম্রাজ্য। মুকুটের সাথে তিনি পেলেন এক অদ্ভুত মিশ্রণ ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতার বিশ্বাস, আর নিজের শৈশবের তিক্ততার শিক্ষা।
প্রথমদিকে, ইভান যেন অন্য এক মানুষ। তিনি সংস্কারের পথে হাঁটলেন ১৫৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন জেমস্কি সোবর, এক ধরনের জাতীয় প্রতিনিধি সভা; ১৫৫০ সালের সুদেবনিক আইনসংহিতা করলেন সংস্কার; সেনাবাহিনীকে স্থায়ী করার জন্য গঠন করলেন স্ট্রেলৎসি বাহিনী। আর সামরিক অভিযানে তিনি ঝড় তুললেন ১৫৫২ সালে জয় করলেন কাজান খানাত, ১৫৫৬ সালে আস্ত্রাখান খানাত ফলে ভলগা নদীর পথ হয়ে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেমে গেল ক্যাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত। সেই সময়ে তিনি সেন্ট বাসিল ক্যাথেড্রাল বানালেন, যা আজও মস্কোর প্রতীক। কিন্তু যত শক্তি বাড়ছিল, ততই তার মধ্যে সন্দেহ, রাগ আর অবিশ্বাস জমতে লাগল। ১৫৬৫ সালে, এক চরম নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিলেন রাশিয়াকে দু’ভাগে ভাগ করলেন। একদিকে ওপ্রিচনিনা তার ব্যক্তিগত প্রশাসন ও বাহিনী; অন্যদিকে বাকিটা সাধারণ রাজ্য। ওপ্রিচনিনা মানে শুধু রাজনৈতিক আলাদা অঞ্চল নয় এটি ছিল এক ভয়ের শাসন ব্যবস্থা। তার কালো পোশাক পরা ওপ্রিচনিকি ঘোড়ার গলায় কুকুরের মাথা আর ঝাড়ু ঝুলিয়ে বেরোত যেন শত্রুর মাংস ছিঁড়ে ফেলবে আর বিশ্বাসঘাতকতা ঝেঁটিয়ে সরাবে।
এই ভয়ের রাজনীতি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার নিল ১৫৭০ সালে, নোভগোরডের গণহত্যা-তে। ইভান বিশ্বাস করলেন, নোভগোরড মস্কোকে বিশ্বাসঘাতকতা করে লিথুয়ানিয়ার সাথে হাত মেলাতে চাইছে। হাজার হাজার মানুষ অভিজাত, পুরোহিত, সাধারণ কৃষক তাদের পরিবারসহ ধরা পড়ল। দিনের পর দিন চলে শাস্তি, ডুবিয়ে মারা, দগ্ধ করা শহরের অর্থনীতি ধ্বংস, সংস্কৃতি বিপর্যস্ত। নোভগোরড আর কখনও তার আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। তারপর এল ক্রিমিয়ান তাতারদের আক্রমণ। ১৫৭১ সালে তারা মস্কো পর্যন্ত পৌঁছে আগুনে পুড়িয়ে দিল শহর। ইভানের ওপ্রিচনিনা এখানে প্রায় ব্যর্থ প্রমাণিত হল। পরের বছর মোলোদি যুদ্ধে রাশিয়া প্রতিশোধ নিলেও, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পেল না। দীর্ঘ লিভোনিয়ান যুদ্ধ (১৫৫৮–১৫৮৩) বাল্টিক সাগরে প্রবেশের স্বপ্ন ভেঙে দেয়, আর দেশের সম্পদ ও জনসংখ্যা ক্ষয়ে যায়। ইভানের ব্যক্তিগত জীবনও তখন ভয়াবহ মোড় নেয়। প্রথম স্ত্রী আনাস্তাসিয়ার রহস্যজনক মৃত্যু তার মানসিক স্থিতি নষ্ট করেছিল; এখন ১৫৮১ সালে রাগের মাথায় পুত্র তাসারেভিচ ইভান ইভানোভিচকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে ফেললেন। আঘাত এত গুরুতর ছিল যে পুত্র মারা গেল। রাজ্যের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার ভেঙে পড়ল, আর ইভানের নিজস্ব আত্মগ্লানি আরও বেড়ে গেল।
১৫৮৪ সালের মার্চে, ইভান মারা গেলেন। পেছনে রেখে গেলেন এক দ্বৈত উত্তরাধিকার তিনি ছিলেন রাশিয়ার প্রথম মহান রাষ্ট্রগঠক, আবার তিনিই ছিলেন এক নির্দয় শাসক, যার রাজত্বে ভয় ছিল ক্ষমতার প্রধান হাতিয়ার। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি যুগের শেষ নয় এটি ছিল এক ঝড়ো সময়ের সূচনা, যা ‘টাইম অফ ট্রাবলস’-এ বিস্ফোরিত হয়।
· Perrie, Maureen. The Image of Ivan the Terrible in Russian Folklore. Cambridge University Press, 1987.
· Platonov, Sergey. Ivan the Terrible. Academic International Press, 1974.
· Skrynnikov, Ruslan. Ivan the Terrible. Gulf Breeze Publishing, 1981.
· Hellie, Richard. Enserfment and Military Change in Muscovy. University of Chicago Press, 1971.
· Bushkovitch, Paul. A Concise History of Russia. Cambridge University Press, 2011.