শতরঞ্চ শব্দটা সংস্কৃত “চতুরঙ্গ” নামক একটি খেলার নাম থেকে নেয়া (চাতুর-আঙ্গ>শাতুর-আঞ্জ>শতরঞ্চ) এবং এভাবেই তা ‘শাতরাঞ্জ' নাম নিয়ে হিন্দুস্তান থেকে আফগান-পারস্য-আরব-ওসমানীদের হাত ধরে ইউরোপে ঢোকে এবং ইউরোপ থেকেই এর সারা দুনিয়ায় বিস্তার ঘটে যদিওবা এরমাঝেই ইউরোপে ঢুকে এর নাম বদলে যায়। চতুরঙ্গের চারটি অঙ্গ হচ্ছে ‘হাতি, ঘোড়া, পানসী এবং পেয়াদা’ আর যেহেতু শাহ* (রাজা) এবং উজির সৈন্যদলের দণ্ডমুণ্ডের হর্তাকর্তা তাই তাদেরকে অঙ্গ হিসেবে ধরা হয় না। চতুরঙ্গ খেলাটা আজকের শতরঞ্চের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। এর নাম নিয়ে আরেকটা মত হচ্ছে ‘শতরঞ্চ' শব্দটা ফারসি ‘শেশ-র্যাঙ্গদ্যান’ (ছয় রঙ) শব্দ থেকে এসেছে, এই ছয় রঙ বা প্রকার হচ্ছে শাহ, উজির, হাতি, ঘোড়া, দূর্গ এবং পেয়াদা। [সালাহউদ্দিন আস-সাফাদী (ফিলিস্তিন-১২৯৬ ঈসায়ী) ২/৯০; আবুল আব্বাস কালকাশিন্দী (১৩৫৫-১৪১৮ ঈসায়ী) ২/১৫৮] ইউরোপে এই খেলাটা যে ইসলামী সংস্কৃতির হাত ধরেই প্রবেশ করেছে তা অনুমান করা যায় স্প্যানিশ “আজেদ্রেজ" আরবি “আশ-শাতরাঞ্জ" এবং জার্মান ‘শাখ" ও ইতালিয়ান “শাকচ্চি’ ফারসি ‘শাহতান’ শব্দদ্বয় থেকে নেয়া হিসেবে। একইভাবে ইংরেজি ‘চেকমেট' শব্দটাও ফারসি ‘শাহ-মাত' থেকে এসেছে। [ইসলামিক এনসাইক্লোপিডিয়া, তুরস্ক]
শতরঞ্চ আগে বদ্ধ জায়গায় ছাদের নিচে খেলা হত, এবং তাতে বড় ‘শতরঞ্চদানি' নামক কাঠের একটা বড় কোট থাকতো। এবং দুই জনের এই খেলায় উভয়েই খেলার সমস্ত নিয়ম মেনে একে অপরের ওপর সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ করবে এবং তার ‘শাহকে মাত’ করার চেষ্টা করবে, এটাই ছিলো এই খেলার নিয়ম যা এখনো বলবৎ আছে। যদি উভয়পক্ষের কোনো শাহকেই মাত না করা যায় তবে খেলা ড্র হয়ে যায়। ৮*৮ মোট ৬৪ ঘরের এই খেলার নির্দিষ্ট নিয়ম আছে এবং উভয়েই একটা করে শাহ, উজির, দুটো করে হাতি, ঘোড়া এবং পানসী আর আটটি করে পেয়াদা পায়। শতরঞ্চের প্রতিটি গুটির বর্তমান সময়ের এইযে আকৃতি তা প্রথমে ইসলামী সমাজে ঢোকার পরে কাঠের ওপরে খোদাইকৃত হিসেবে শাহ, উজির, হাতি, ঘোড়া, দুর্গ এবং পেয়াদার আকৃতি পায়। প্রতিটি গুটির আলাদা মান এবং নির্দিষ্ট এই আকৃতি সপ্তম শতকে একেবারে সাবিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। [আদলি - আবু বকর আস-সুলী ও অন্যান্য, পৃষ্ঠা-১৩; ফেরদৌসি - ৩, ১৩৯৮; রাগিব ইসফাহানি, ১/৪৪৭] আল-বিরুনী তার 'তাহকিকু মালিল হিন্দ’ কিতাবের ৯০-৯১ পৃষ্ঠায় হিন্দুস্তানে শতরঞ্চের খেলার পদ্ধতি এবং প্রতিটি গুটির পদমর্যাদা এবং মানের বর্ণনা উল্লেখ করেন। এবং তার বর্ণনা করা সেই ‘শতরঞ্চ' খেলার জন্য চারজন খেলোয়াড় এবং প্রতিবারে জোড়া গুটির চাল দিয়ে খেলা লাগতো। তার এই বর্ণনা থেকেই ‘শতরঞ্চ' একটি হিন্দুস্তানি খেলা হিসেবেই ধরে নেয়া হয়। তবে খেলাটির এই ধরণকে জটিল এবং বিরক্তিকর বলে এর সংস্কার করা হয় এবং চারজনের বদলে একে দুজনের খেলায় রূপান্তর করা হয়। এভাবেই সেই ‘চতুরঙ্গ' এখনকার ‘শতরঞ্চ' নামক খেলায় রূপ নেয়। মুসলমানদের হাত ধরে শতরঞ্চ নানাভাবে পরিবর্তন হয়ে প্রায় দশটি আলাদা আলাদা খেলার ধরণে রূপ নেয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় এবং এর গুটিগুলোর বিশেষ রূপ দেয়াও হয় মুসলমানদের হাত ধরে, যেমন শাহের মাথার মুকুট এবং পেয়াদার মাথার পাগড়ী। এর সবই অন্য সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে সেই সংস্কৃতিতে থাকা উপাদান অনুযায়ী রূপ নিয়েছে। ১০৬১ সালের শুরুর দিকে ইউরোপীয় চার্চ এই খেলাকে ‘ইসলামিক সংস্কৃতির অংশ’ হিসেবে শতরঞ্চ খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে চারশো বছর পরে ১৪৭৫ সালের দিকে ইউরোপে উজির এর বদলে ‘রাণী’, হাতির বদলে ‘বিশপ’ এবং ঘোড়ার বদলে ‘নাইট' শব্দ ব্যবহার করা হয় এবং এর আকৃতি বদলিয়ে খেলা শুরু করা হয় যারফলে এর ওপর থেকে চার্চের নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া হয় এবং তৎকালীন ইসলামী খেলাফতের ইউরোপীয় অঞ্চলে ব্যাপ্তির ফলে দ্রুত পুরো ইউরোপে এর প্রসার ঘটে।
শতরঞ্চকেই বাংলায় দাবা বলা হয়। যা একটা সময় ইউরোপীয়রা ''মুসলিম সংস্কৃতি'' বলে ৪০০ বছর বর্জন করেছিল তা এখন আমরা ''বিজাতীয় সংস্কৃতি'' বলে বর্জন করছি। আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে এই ব্যাপারগুলোর পুনরায় আমাদের সমাজের আলোচনায় ফিরে আসার কারণটাকে অনেকটা এমন মনে হয় যেমনটা ''গ্রীক ফিলসফি'' ইসলামী সভ্যতায় এসে আরবি তাশরীহ এবং চর্চার মাধ্যমে আরও উন্নত হয়ে পুনরায় ইউরোপে ফেরত যাওয়ার পরে ওদের কাছে যেমনটা লাগতো ঠিক সেই অবস্থা হয়েছে আমাদের। কারণ ইউরোপীয়রা গ্রীক ফিলসফি শিখেছে মূলত আরব-ইসলামী ফিলোসফারদের কাজ থেকে, অনুবাদ-তাশরীহ থেকে। এখন আমরা ইউরোপীয় চিন্তাধারা বলে যেসব চিন্তাকে বাতিল বা বর্জনীয় বলছি তার অনেক অধিকাংশ চিন্তাই ইউরোপ পেয়েছে মুসলিম সভ্যতা থেকে। মানে অনেকটা আমাদের সংস্কৃতি অন্য কেউ আপন করে নিয়েছে বলে তাকে আর নিজের বলে মনে না করে বাদ দিয়ে দেওয়া বলা চলে এই অবস্থাকে। অথচ আমাদের উচিৎ ছিল যে ইউরোপ থেকে আমাদের চিন্তাধারাগুলো আমাদের সভ্যতায় ফিরিয়ে আনা। তবে এখানেই আলিম এবং দ্বীনী রাহবারদের মূল কাজ যে ওদের থেকে আমাদের ইলম-সম্পদ ফেরত আনতে হবে কিন্তু তার সাথে ওদের সামাজিক সংস্কৃতিকে কখনোই আনা যাবে না।
