একজন রাজার জন্ম:
১৮৩৫ সালের ৯ এপ্রিল, ব্রাসেলসের রাজপ্রাসাদে জন্ম নিলেন এক রাজপুত্র লিওপোল্ড। তিনি ছিলেন বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ড প্রথম ও রানী লুইস মারির দ্বিতীয় সন্তান, কিন্তু বড় ছেলে হিসেবে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। ভাগ্যের খেলায়, তার বড় ভাই আগেই মারা যান, ফলে জন্মের পর থেকেই রাজমুকুট যেন নির্ধারিত হয়ে গেল। নয় বছর বয়সে তিনি হয়ে গেলেন ব্রাবান্টের ডিউক, সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ধাপে ধাপে লেফটেন্যান্ট-জেনারেল পর্যন্ত উঠলেন। বইপত্রে যেমন বলা হয় “প্রস্তুত রাজা” লিওপোল্ড ছিলেন তেমনই, তবে তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল এক ভিন্ন স্বপ্ন বেলজিয়ামের বাইরে ‘নিজের’ একটা উপনিবেশ।
১৮৬৫ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে রাজা বনে গেলেন লিওপোল্ড দ্বিতীয়। ঘরোয়া রাজনীতিতে তার রাজত্ব চিহ্নিত হয়েছিল স্কুল সংস্কার, শ্রমিক অধিকার, সামাজিক আইন ও সামরিক শক্তিবৃদ্ধি দিয়ে। তিনি ছিলেন এক ধরনের ‘মাস্টার প্ল্যানার’। বেলজিয়ামের শহরগুলোতে আধুনিক অবকাঠামো, দালান, পার্ক, স্মৃতিস্তম্ভ সব কিছু গড়ে তুলতে লাগলেন। এজন্য তাকে বলা হয় “বিল্ডার কিং”। কিন্তু এই বিল্ডিং, রাস্তা, সৌন্দর্যবর্ধনের পেছনের টাকার উৎস? এখানেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়।
স্বপ্নের উপনিবেশ- কঙ্গো ফ্রি স্টেট:
লিওপোল্ডের চোখ ছিল আফ্রিকায়। অভিযাত্রী হেনরি মর্টন স্ট্যানলির সহায়তায় তিনি বর্তমান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো দখলের পরিকল্পনা করলেন। ১৮৮৪-৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনে ইউরোপের বড় বড় শক্তিগুলো তার দাবি মেনে নিল, শর্ত ছিল কঙ্গোর মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল, তা ছিল ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস অধ্যায়।
‘ব্যক্তিগত’ উপনিবেশ ও ভয়ঙ্কর শাসন:
কঙ্গো ফ্রি স্টেট ছিল রাজা লিওপোল্ডের ব্যক্তিগত সম্পত্তি কোনো সরকারি উপনিবেশ নয়। রাজধানী ব্রাসেলসে বসে, তিনি কঙ্গো শাসন করতেন ভাড়াটে সেনাবাহিনী “ফোর্স পাবলিক” দিয়ে। প্রথমে হাতির দাঁতের ব্যবসা, পরে বিশ্বব্যাপী রাবারের চাহিদা বাড়তেই তিনি জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কঙ্গোলিজকে রাবার সংগ্রহে বাধ্য করলেন। কোটা পূরণ না হলে শাস্তি ছিল অকল্পনীয় নির্যাতন, হত্যা, এমনকি হাত কেটে ফেলা। এক ভয়ঙ্কর নিয়ম ছিল যে সৈন্য গুলি চালাবে, তাকে ‘প্রমাণ’ হিসেবে নিহত ব্যক্তির হাত আনতে হবে। ফলে ‘রাবার’ ও ‘কাটা হাত’ হয়ে উঠল কঙ্গোর প্রতিদিনের বাস্তবতা।
১৮৯০ সালে আফ্রিকায় ভ্রমণ শেষে আফ্রিকান-আমেরিকান সাংবাদিক জর্জ ওয়াশিংটন উইলিয়ামস এই শাসনকে প্রথমবারের মতো “Crimes Against Humanity” বলে অভিহিত করেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ কনসাল রজার কেসমেন্টের রিপোর্ট, সাংবাদিক ই.ডি. মোরেলের প্রচারণা, ও আন্তর্জাতিক চাপের ফলে এই ভয়াবহতা বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি ঐতিহাসিকদের অনুমান, লিওপোল্ডের শাসনে কঙ্গোর জনসংখ্যা ১ কোটি থেকে ১.৫ কোটি কমে যায়। এর পেছনে ছিল মহামারী, দুর্ভিক্ষ, জোরপূর্বক শ্রম, ও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ।
বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠল। ১৯০৮ সালে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বেলজিয়াম সরকার কঙ্গো ফ্রি স্টেটকে লিওপোল্ডের হাত থেকে নিয়ে নেয়, নাম হয় “বেলজিয়ান কঙ্গো”। কিন্তু লিওপোল্ড শেষ চেষ্টা করলেন প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য কঙ্গোর সরকারি নথি পুড়িয়ে ফেললেন। তার কথা ছিল,
“আমি সেখানে যা করেছি, তা জানার তাদের কোনো অধিকার নেই।”
বেলজিয়ামে লিওপোল্ড II রয়ে গেলেন “বিল্ডার কিং”, যিনি দেশকে আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু আফ্রিকার বুকে তিনি আজও “বুচার অব কঙ্গো” এক রাজা, যিনি ব্যক্তিগত লোভে একটি দেশের ইতিহাস ও জনসংখ্যা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।